ইউজিসির নির্দেশনা মানতে জাবি প্রশাসনের গড়িমসি

ঢাকা, সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯ | ৩ আষাঢ় ১৪২৬

ইউজিসির নির্দেশনা মানতে জাবি প্রশাসনের গড়িমসি

জাবি প্রতিনিধি ৫:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০১৬

ইউজিসির নির্দেশনা মানতে জাবি প্রশাসনের গড়িমসি

কর্মকর্তা কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৬২ হতে ৬০ এ ফিরিয়ে আনার জন্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। তবে দুই কর্মকর্তাকে সুবিধা দিতে ইউজিসির এ নির্দেশ মানতে গড়িমসি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে জাবি প্রশাসনের বিরুদ্ধে। শনিবার বার্ষিক সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টিকে তারা গুরুত্ব দিয়ে এজেন্ডাভূক্ত করেনি।

জানা গেছে, অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী ৬০ বছরেই অবসরে যেতে চান। তারা মনে করেন, যেহেতু সরকার বর্ধিত বয়সকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন সেহেতু সরকার অর্থ দিবে না। কারণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও অর্থের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের হাতে। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে পরে পেনশন হতে তাদের অর্থ কেটে রাখা হবে বলে মনে করছেন তারা। এরকম কিছু হলে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে বাধ্য হবেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।

অভিযোগ উঠেছে, ৬০ বছর পূর্তিতে রেজিস্ট্রার আবু বকর সিদ্দিককে চলতি মাসে অবসর গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া ৬২ বছরে অবসরে গেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. এ টি এম আবদুল হান্নান। এই বর্ধিত বয়সসীমার অধীনে এই দুই কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সুবিধা দিতেই সরকারের নির্দেশনা মানতে প্রশাসনের অনীহা বলে জানা গেছে। প্রশাসনের ইন্ধনে বর্ধিত বয়সসীমার পক্ষে অফিসার সমিতির দুই-একজন নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সমর্থন নেয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান একাধিক কর্মকর্তা।

১৮ মে তারিখে ইউজিসির পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) মো. মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আইন ও সংঘবিধি অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়স ৬০ বছর। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চাকরীর বয়স বৃদ্ধি করা বিধি বহির্ভূত। ফলে তাদের চাকরীতে অবসরের বয়স কোনো অবস্থায় ৬২ বছর করার সুযোগ নেই। শুধু সরকারই চাকরীর বয়স বৃদ্ধি করতে পারে। বিধি বহির্ভূতভাবে যেসকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরীতে অবসরের বয়স ৬২ বছর করা হয়েছে তাদেরকে নিয়ম অনুযায়ী ৬০ বছর বয়সে অবসরে যেতে হবে এবং বিধি বহির্ভূতভাবে চাকুরীরত অবস্থায় গৃহীত বেতন ও ভাতাদি পেনশনের সাথে সমন্বয় করতে হবে।’

চিঠিটি ১৮ তারিখে পাঠানো হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এটি প্রকাশ করেন ২৮ মে। যদিও ২৭ মে সিন্ডিকেট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইচ্ছা করেই সিন্ডিকেট অধিবেশনের আগে চিঠিটি প্রকাশ করেননি বলে অভিযোগ রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে।

তবে এ ব্যাপারে রেজিস্ট্রার জানান তিনি চিঠিটি ২৮ তারিখেই পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ইউজিসিতে যোগাযোগ করা হলে এ প্রতিবেদককে বলা হয় ‘আমরা চিঠি ১৮ তারিখেই পাঠিয়েছি। ঢাকা থেকে জাহাঙ্গীরনগরে পৌঁছতে বড়জোর তিন-চারদিন সময় লাগতে পারে।'

এদিকে সরকারের অনুমোদন ছাড়া কর্মকর্তা কর্মচারীদের বয়সসীমা বাড়ানোয় বিশ্ববিদ্যালয় ৩ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। কারণ বর্ধিত বয়সসীমা ২০১৪ সাল থেকেই কার্যকর করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বয়সসীমা ৬০ বছর ছিল। এ হিসাবে ২০১৪ সালের জুনে ১৭ জন ও ২০১৫ সালের জুনে ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও দুই বছর বৃদ্ধি করায় তারা ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের জুনে অবসরে যাবেন। বর্ধিত বয়সসীমা অনুযায়ী ১৭ জন দুই বছর এবং ২২ জন এক বছর চাকুরী করেছেন। এ হিসেবে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বর্ধিত সময়ের বেতন ও অন্যান্য ভাতা বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে পরিশোধ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ায় পরের অর্থবছর গুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতির পরিমাণ আরোও বৃদ্ধি পাবে।

২০১২ সালে জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু জাবি প্রশাসন সংসদের এই আইনকে তোয়াক্কা না করে বিশেষ ব্যক্তিদের সামনে রেখে শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর করে। পরে সরকারের প্রবল আপত্তির মুখে গত বছরের ৩১ জুলাই সিনেটের জরুরি সভায় আগের সিদ্ধান্তটি বাতিল করে ৬৫ বছর পুনর্বহাল করতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

৬৫ বছর অনুযায়ী ১০জন শিক্ষক ২০১৪ সালেই অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও দুই বছর বৃদ্ধি করায় তারা ২০১৬ সালে অবসরে যান। ওই ১০ শিক্ষককে বর্ধিত সময়ের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। এতে প্রশাসন ব্যাপক সমালোচনা মুখে পড়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭০ লক্ষাধিক টাকা।

ইউজিসি থেকে নির্দেশনা জারির পরও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বয়সসীমা কমানোর বিষয়টিকে শনিবারের সিনেট অধিবেশনে কি কারণে এজেন্ডাভূক্ত করা হয়নি সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার আবু বকর সিদ্দিক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সিনেটের এজেন্ডা আগেই ঠিক হয়ে গেছে। এটা নিয়ে আলোচনা চলছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেন বলেন, ‘সরকার না চাইলে চাকরীর বয়স বাড়ানো যাবেনা।’

এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এই সিনেটে এজেন্ডাভূক্ত করা হয়নি কেন সে সম্পর্কে জানতে চাইলে কোন স্পষ্ট কথা না বলে তিনি বলেন, ‘নতুন করে চাইলে এজেন্ডাভূক্ত করা যাবে। দেখা যাক।’

এর আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘কর্মকর্তা কর্মচারীদের বয়স ৬০ বছরে ফিরিয়ে আনতে সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু চলতি মাসেই তা করতে হবে এমন কোনো নির্দেশনা নেই।’

তবে সরকার যেহেতু বর্ধিত সময়কে অবৈধ ঘোষণা করেছেন তাই এই সময়ের অর্থ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে দিবে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে অতিরিক্ত সময়ের জন্য অর্থ ভর্তুকিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শিক্ষার্থীরা। বরাদ্দ কমে যাবে শিক্ষার্থী স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে।

এসব বিষয়ে  বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি। তবে এর আগে উপাচার্য ‘কয়েকজন  প্রবীণ কর্মকর্তাকে রাখা গেলে ভালোই হয়’ বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন।

এইচএএম/জেআই/কেআরএস