কেঁদেই চলেছে মেসির আর্জেন্টিনা

ঢাকা, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

কেঁদেই চলেছে মেসির আর্জেন্টিনা

আরেফিন ইসলাম ৮:৫৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৬

কেঁদেই চলেছে মেসির আর্জেন্টিনা

১৯৯৩ থেকে ২০১৬- দীর্ঘ ২৩ বছরের পথ পরিক্রমা। বিশ্ব ফুটবলে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু আর্জেন্টিনার ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। প্রায় দুই যুগ ধরে কেঁদেই চলেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল। ১৯৯৩ সালে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে কোপা আমেরিকার শিরোপা জয় করেছিল নীল-সাদা শিবির। এরপর কেটে গেছে ২৩ বছর। কিন্তু খুব কাছে গিয়েও একবারও শিরোপা ছুঁয়ে দেখা হয়নি আর্জেন্টিনার। প্রতিবারই কান্না, হতাশা ও চোখের জলে মাঠ ছাড়তে হয় ডিয়েগো ম্যারাডোনার দেশকে।

আর্জেন্টিনার হতাশার শুরু ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে। ১৯৮৬ সালে জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা জয় করেছিল ম্যারাডোনার দল। চার বছর পরের ফাইনালে ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামে আর্জেন্টিনা; প্রতিপক্ষ সেই জার্মানিই। তবে ফাইনালের মঞ্চে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েন ম্যারাডোনা। তারপরও সমান তালেই লড়ছিল লাতিন আমেরিকান দলটি।

কিন্তু অন্তিম মুহূর্তে তীরে এসে তরী ডোবায় আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার আগে আর্জেন্টাইন তারকা রবার্তো সেনসিনি জার্মান তারকা রুডি ভোলারকে ফাউল করলে রেফারি বিতর্কিত পেনাল্টির নির্দেশ দেন। স্পট-কিক থেকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে জার্মানিকে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পাইয়ে দেন আন্দ্রেস ব্রাহমি।

১৯৯০ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সময় নেয়নি আর্জেন্টিনা। তিন বছরের ব্যবধানে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার আর্জেন্টিনা টানা দুবার কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে কিছুটা হলেও সেই ক্ষতে প্রলেপ দেয়। এরপর শুধু কান্না, বেদনা আর হতাশার প্রতিচ্ছবি নীল-সাদা শিবিরে। ১৯৯০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ছাড়াও ২০০৪, ২০০৭ ও ২০১৫  সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও হেরে যায় আলবিসেলেস্তে শিবির। কোপা আমেরিকার শতবর্ষী টুর্নামেন্টেও চোখের জল সঙ্গী হয় মেসিদের।

২০০৪ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ওঠার পথে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দেয় আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালে কলম্বিয়াকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় হাভিয়ের জানেত্তি-হাভিয়ের মাশ্চেরানোর দল। অন্যদিকে ফাইনালে আসার পথে উরুগুয়েকে টাইব্রেকারে পরাজিত করে ব্রাজিল।

লিমার স্তাদিও নাশিওনালে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ২০ মিনিটের মাথায় গঞ্জালেসের গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে লুইস দা সিলভার গোলে ব্রাজিল সমতায় ফিরলেও ম্যাচে আধিপত্য ছিল আর্জেন্টিনারই। ৮৭তম মিনিটে সিজার ডিলগেডো গোল করলে আর্জেন্টিনা শিরোপা উৎসবের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

তবে সেই উৎসবে জল ঢেলে দেন আদ্রিয়ানো। ইনজুরি সময়ের শেষ মুহূর্তে আদ্রিয়ানোর গোলে ম্যাচে রোমাঞ্চ ফিরে আসে। এরপর টাইব্রেকারে গড়ায় ম্যাচ। টাইব্রকারে গ্যাব্রিয়েল হেইঞ্জ ও আন্দ্রেস ডি আলেজান্দ্র গোল করতে ব্যর্থ হলে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় সাম্বার দেশ ব্রাজিল।

২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয়ার পর ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকার শিরোপা জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। এবারও ফাইনালে ব্রাজিলের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় নীল-সাদা শিবিরের। পাঁচ ম্যাচে ১৬ গোল করে দুর্দান্ত দাপটেই ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। তবে শিরোপার লড়াইয়ে এসে খেই হারিয়ে ফেলে দলটি।

ফাইনালে দানি আলভেজ, রবিনহো ও মাইকনদের সঙ্গে পেরে ওঠেননি লিওনেল মেসি ও হাভিয়ের মাশ্চেরানোরা। আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে ব্যাক টু ব্যাক কোপার শিরোপা ঘরে তোলে ব্রাজিল। তখনকার ২০ বছর বয়সী তরুণ মেসি আজ ২৯ বছরের পোড় খাওয়া খেলোয়াড়। বয়স বদলেছে কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি মেসি ও আর্জেন্টিনার।

এরপর ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১১ সালের কোপা আমেরিকায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি আর্জেন্টিনা। তবে ২০১৪ বিশ্বকাপে বিশ্বের সর্বকালের সেরা হিসেবে বিবেচিত মেসিকে নিয়ে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়েই ব্রাজিল বিশ্বকাপে অংশ নেয় আর্জেন্টিনা।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে 'সর্বকালের সেরা' খেলোয়াড় হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। শিরোপা উৎসবে মেতে ওঠার বেশ কয়েকটি সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি মেসি-হিগুয়েনরা। ফলাফল- মারিও গোটশের শেষ মুহূর্তের গোলে চোখের জলে মাঠ ছাড়েন মেসিরা। এক বছর পর কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে হতাশাকে সঙ্গী করেই মাঠ ছাড়ে আলবিসেলেস্তে শিবির।

এবার নতুন এক বছর। নতুন এক কোপা আমেরিকার ফাইনাল। নতুন মহাদেশে ফের মুখোমুখি একই প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা ও চিলি। মেসির দুর্দান্ত ফর্ম শিরোপার স্বপ্ন দেখাচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে। তবে স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। শিরোপা অধরাই রয়ে গেল আর্জেন্টিনা ও মেসির।

গত বছর কোপা আমেরিকার ফাইনালে টাইব্রেকারে চিলির কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। এবারও একই পরিণতি বরণ করতে হলো মেসিদের। টাইব্রেকার নামক ভাগ্য পরীক্ষায় স্বপ্নভঙ্গ হয় মেসিদের।

নিয়তির কি নির্মম পরিহাস। নিউ জার্সির স্টেডিয়াম মেসিকে মহানায়ক বানানোর যেই মঞ্চ সাজিয়ে রেখেছিল সেই মঞ্চে নায়ক নন; খলনায়ক হলেন তিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম টাইব্রেক শটটি মেসি মিস না করলে ম্যাচের ফলাফল বদলে যেতে পারতো। তবে প্রবাদ রয়েছে না, ‘ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডন।’ মেসিও পারেননি নিজের ও আর্জেন্টিনার ভাগ্য ফেরাতে। ম্যাচ শেষে যথারীতি চ্যাম্পিয়ন ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গিয়েছেন তিনি। কিন্তু তা স্পর্শ করার ভাগ্য হয়নি।

১৯৯০ ‍বিশ্বকাপ বাদে ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০০৪, ২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নীল হয় আর্জেন্টিনা।

ফুটবলের দুঃখী যুবরাজ কে? এমন প্রশ্ন করলে সবাই চোখ বন্ধ করে নিশ্চিতভাবে মেসির নাম বলবেন। আর্জেন্টিনার হয়ে মেজর টুর্নামেন্টের চার-চারটি ফাইনাল খেলে প্রতিবারই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাকে। চারটি ফাইনালেই গোল করতে ব্যর্থ হন মেসি। বিশেষ করে গত তিনটি টুর্নামেন্টের (২০১০ বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকা) শুরু থেকেই দুর্দান্ত খেলে আসছিলেন তিনি। কিন্তু ফাইনালে এসেই যেন নিজের জাদুর কাঠি হারিয়ে ফেলেন কিং লিও। ফলে আর্জেন্টিনা ও ফুটবল জাদুকরকে চোখের জলেই বিদায় নিতে হয়।

চার-চারটি ফাইনালে হারের ধাক্কা সামলাতে পারেননি মেসি। যে কারণে কোপার শতবর্ষী টুর্নামেন্টের ফাইনাল শেষে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে যেন কথাই বের হচ্ছিল না মেসির মুখ দিয়ে।

সত্যিই কি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন না মেসি? সময়ই সেটি বলে দেবে। তবে ফাইনালে হারের পর কান্না ভেজা কণ্ঠে বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন কিং লিও, ‘জাতীয় দলের হয়ে আমার সময় শেষ। চার-চারটি ফাইনালে খেলেছি। এটি (শিরোপা) আমার জন্য নয়। আমি খুব করে একটি শিরোপা জিততে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটি পারলাম না। তাই এখানেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলাম। আমার হৃদয়ের অনুভূতি এটা এবং আমার যা মনে হয়েছে আমি তা বলে দিয়েছি। এটি খুবই বেদনাদায়ক মুহূর্ত। এটি এমন এক কঠিন মুহূর্ত যা বলে বা ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবে না। লকার রুমে আমি এটি নিয়ে ভেবেছি। জাতীয় দল আমার জন্য নয়।’

আর্জেন্টিনার সোনালী প্রজন্ম বারবার স্বপ্ন জাগিয়েও দলকে শিরোপা জেতাতে ব্যর্থ হন। মেসি নামক জাদুকরের ছোঁয়ায় সেই আক্ষেপ ঘোচানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন সবাই। কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। দুই যুগ ধরে কেঁদেই চলেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল। এই কান্নার শেষ কোথায়!

এমএআই/এটি