ইইউতে ভাঙন ও মার্কিন নির্বাচন

ঢাকা, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯ | ১১ বৈশাখ ১৪২৬

ইইউতে ভাঙন ও মার্কিন নির্বাচন

ফকির ইলিয়াস ১২:৫৩ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৬

ইইউতে ভাঙন ও মার্কিন নির্বাচন

শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্য বেরিয়ে গেল। ৫২ শতাংশ ভোটে জিতে গেল 'বেরিয়ে আসা' পক্ষ। থাকায় মত দিয়েছিলেন ৪৮ শাতংশ ভোটার। এই বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে চার দশকের বেশি সময়ের ঐক্য ভেস্তে গেল। জয় হলো বৃটিশ একত্ববাদের।

এই ঘটনা নিয়ে বিশ্ব এখন উত্তপ্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। স্কটল্যান্ডে তার নিজের গলফ কোর্স দেখতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এটা একটা দারুণ ব্যাপার যে যুক্তরাজ্যের জনগণ তাদের ‘নিজ দেশকে ফিরে পেয়েছে’।

এখানে একটি বিষয় বলা দরকার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা চেয়েছিলেন ইংল্যান্ড, ইইউ তে থাকুক। গত কয়েকমাস আগে ইংল্যান্ড সফরের সময় ওবামার একটি প্রবন্ধ ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল৷ সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘ইইউ-র সদস্যপদ বৃটেনের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়িয়েছে এবং ঐ সদস্যপদ দেশটির বৈশ্বিক প্রভাবের জন্য হুমকি নয়৷' ওবামা বলেছিলেন, ব্রিটেন ইইউ-তে থাকবে কিনা – সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার শুধু ব্রিটিশ নাগরিকদেরই রয়েছে, তবে ব্রিটেনের ইইউ সদস্যপদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘গভীর আগ্রহ' রয়েছে৷

ওবামার এমন বক্তব্যকে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মনে করছিলেন ব্রেক্সিটের পক্ষের নেতারা৷ বৃটেনের ইইউ-বিরোধী রাজনৈতিক দল ইন্ডিপেন্ডেন্টস পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজে বলেছিলেন, ওবামার এই ব্যাপারে ‘জড়ানো ঠিক নয়'৷ সাবেক মন্ত্রী ইয়ান ডানকান স্মিথ বলেছিলেন, তিনি বুঝতে পারছেন না একজন মার্কিন নেতার এই ব্যাপারে জড়িত হওয়া কীভাবে ‘যুক্তিসঙ্গত' হতে পারে৷ এছাড়া প্রায় ১০০ জন ব্রিটিশ সাংসদ তাদের অসন্তোষের বিষয়টি লন্ডনের মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন সেই সময়ে।

এদিকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের উপাত্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে, বারাক ওবামা ইংল্যান্ডের বেরিয়ে আসাকে সমর্থন না করলেও, মার্কিনী বেশ কিছু প্রভাবশালী রাজনীতিক ছিলেন ইংল্যান্ডের গণমানুষের পক্ষে। তারা চেয়েছেন- ইংল্যান্ড ইই্উ-থেকে বেরিয়ে আসুক। নিজের মতো করে দাঁড়াক। তাদেরই একজন প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন। আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের এই রাজনীতিক প্রেসিডেন্ট ওবামাকে আগেই জানিয়েছিলেন, বৃটেনের জনগণ যদি 'বেরিয়ে আসা'র পক্ষে ভোট দেয়- তবে ইংল্যান্ডকে কোনো 'পানিশম্যান্ট' যেন বারাক ওবামা না দেন।

সিনেটর টম কটন খুব দৃঢ় কন্ঠে বলেন- ওবামা প্রশাসন বৃটেনের বিরুদ্ধে কোনো অর্থনৈতিক অবরোধ জারী করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকা না থাকার সাথে বৃটেন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের কোনো ফাটল দেখা দেবে না। দিতে পারেনা। 

সিনেটর কটন বলেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন একটি ব্যর্থ সংঘ। তারা অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক উন্নতি কিছুই করতে পারেনি। তিনি বলেন, বৃটেনকে হারানোর মাধ্যমে ইউরোপ সপ্তাহে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড হারাবে। অন্যান্য ইউরোপিয় দেশ থেকে যারা বৃটেনে কাজ করতে যায়- ক্ষতিগ্রস্থ হবে তারাই। এখানে বৃটেনের কিছুই হারাবার নেই। সিনেটর টম কটনের এই বক্তব্যকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেছেন- সিনেটর টেড ক্রুজ(ট্যাক্সাস), সিনেটর মাইক লি (ইউটা), সিনেটর জেফ সেশনস (আলাবামা)।

তারা একটি চিঠিতে বারাক ওবামাকে বৃটেনের গণমানুষের রায়কে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছেন। আরও ১১ জন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান এটাকে সমর্থন করেছেন। একটা বিষয় এখানে পরিষ্কার, প্রেসিডেন্ট চাইলেই একক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। যে প্রমাণ আমরা আবারও পেলাম। বৃটেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যত দুভাগে বিভক্ত। এই বিভক্তি বেশ শক্ত প্রভাব ফেলতে পারে আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও। বারাক ওবামা এখন শেষ সময়ে এসে হেরে যাচ্ছেন নিজের কাছেই।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্থগিত হয়ে গিয়েছে ওবামার ইমিগ্রেশন বিষয়ক নির্বাহী আদেশ। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক নির্বাহী আদেশের ঘোষণা দেন। তার ওই আদেশবলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৫০ লাখ অবৈধ অভিবাসীর বৈধতা পাওয়ার পথ সুগম হয়েছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের এক বিভক্ত রায়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ স্থগিত হয়ে গিয়েছে।সুপ্রিম কোর্টের এই বিভক্ত রায়ে বাংলাদেশিসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ এবং হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের পর নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, লস অ্যাঞ্জেলেস, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, আরিজোনাসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ লোক অবৈধভাবে বসবাস করছেন। ডেমোক্র্যাটদের এই পরাজয়ে মহাখুশি রিপাবলিকানরা। তারা মনে করছেন, এর প্রভাব পড়বে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। পাশ করতে পারেন রিপাবলিকান প্রার্থী। ফ্লোরিডার অরলান্ডোতে একটি ক্লাবে ওমর মতিন কর্তৃক ৫০ জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনাও রিপাবলিকানদের পালে হাওয়া দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে গণভোটে ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পর পরই নেদারল্যান্ডসের অভিবাসন-বিরোধী উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা গেয়ার্ট ওয়াইল্ডার্সের দাবি তুলেছেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসুক নেদারল্যান্ডস৷ গেয়ার্টের হুমকি, আগামী নির্বাচনে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে ইইউতে থাকা বা না থাকার বিষয়ে গণভোটের পথই বেছে নেবেন৷ দেশবাসীই ঠিক করবেন তাঁরা কী চান৷

খবর বেরিয়েছে, ব্রেক্সিট আটকানোর চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছেন স্কটিশ ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টার্জেন। স্কটল্যান্ডে থেকে যাওয়ার পক্ষে ৬২ শতাংশ এবং বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মাত্র ৩৮ শতাংশ ভোট পড়ে। বিবিসি-র এক অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) প্রধান স্টার্জেওনকে ভোটের পর স্কটিশ পার্লামেন্টের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল।

জবাবে স্টার্জেওন বলেন, তিনি অবশ্যই স্কটিশ এমপি’দের এ বিষয়ে সম্মতি না দেওয়ার কথা বলবেন। স্কটিশ পার্লামেন্ট স্কটল্যান্ডের জন্য কোনটি ঠিক হবে তার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করলে আমরা বলতে পারি, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে যাবে এমন কিছুতে আমরা ভোট দিতে পারি না। অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্টে ১২৯টি আসনের মধ্যে ৬৩টি এসএনপি-র দখলে। যুক্তরাজ্যের ব্যবস্থায় স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দান আয়ারল্যান্ডকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ওই ক্ষমতা অনুযায়ী, লন্ডন পার্লামেন্টে কোনও বিল অনুমোদনের পর তা কার্যকর করতে হলে বিলটিতে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দান আয়ারল্যান্ডের পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।

সবমিলিয়ে বিষয়টি বেশ জটিলতার দিকেই এগোচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্রিটেনের সদস্য পদ নিয়ে দ্বিতীয় একটি গণভোটের জন্যে এক আবেদনে ২৫ লাখেরও বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে। এই আবেদনটি বিবেচনা করে দেখবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। কারণ সাধারণত কোনো পিটিশনে এক লাখের বেশি স্বাক্ষর থাকলে পার্লামেন্টে সে বিষয়ে আলোচনা হয়। দ্বিতীয়বার গণভোটের দাবিতে পিটিশনের উদ্যোগ নেন উইলিয়াম অলিভার হিলে। তিনি বলছেন, ‘আমরা যারা এখানে সই করেছি, তারা সরকারের কাছে আবেদন করছি এমন একটি আইন করতে যে কোনো পক্ষে যদি ৬০ শতাংশের বেশি ভোট না পড়ে এবং মোট ভোট গ্রহণের হার যদি ৭৫ শতাংশের বেশি না হয়, তাহলে আরেকটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।’

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃটেনের এই সিদ্ধান্ত, চলতি সময়ে বদলে দিয়েছে বিশ্ব রাজনীতির অনেক হিসেব নিকেশ। কি হবে- কি হতে যাচ্ছে তা দেখার জন্য আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। যা মার্কিনী রাজনীতি তো বটেই, বিশ্বের রাজনীতিতে একটি মোটা দাগ এঁকে দিতে পারে আগামী কয়েক মাসের মাঝেই।

নিউইয়র্ক, ২৭ জুন ২০১৬

ফকির ইলিয়াস : কবি, লেখক, কলামিস্ট।
[email protected] com