কোপায় ফের কাঁদলো মেসি ও আর্জেন্টিনা

ঢাকা, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯ | ১১ বৈশাখ ১৪২৬

কোপায় ফের কাঁদলো মেসি ও আর্জেন্টিনা

আরেফিন ইসলাম ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৬

কোপায় ফের কাঁদলো মেসি ও আর্জেন্টিনা

১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনা সর্বশেষ যখন মেজর শিরোপা জিতেছিল লিওনেল মেসির বয়স তখনও ছয় বছর পূর্ণ হয়নি। একজন কিশোর, তরুণ বয়সে বেশ কয়েকবার আর্জেন্টিনাকে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তে দেখেছেন তিনি। খেলোয়াড় হিসেবে নিজেও সেই যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েছেন। কান্না, হতাশা ও না পাওয়ার বেদনায় নীল হয়েছেন বেশ কয়েকবার। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে আরেকটি ফাইনালে মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। তবে শিরোপা ছুঁয়ে দেখতে পারেনি দলটি। ফের কান্না ও হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে মেসিদের।

চিলিকে হারিয়ে প্রায় দুই যুগের শিরোপার আক্ষেপ ঘোচানোর পাশাপাশি প্রতিশোধ নেয়ারও সুযোগ ছিল আর্জেন্টিনার সামনে। এক বছর আগে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হেরে মাথা নিচু করে মাঠ ছেড়েছিলেন মেসিরা। এক বছর পরও একই পরিণতি বরণ করতে হলো আর্জেন্টিনাকে। কোপা আমেরিকার শতবর্ষী টুর্নামেন্টের ফাইনালে রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ব্যাক টু ব্যাক শিরোপা ঘরে তুলল চিলি।

ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধের শুরুটা ছিল রোমাঞ্চকর ও শারীরিক সংঘর্ষের মিশেলে দারুণ লড়াই। তবে প্রথমার্ধের শেষ দিকে রেফারির বাজে সিদ্ধান্তের কারণে দুই দলের দুজন খেলোয়াড়কেই মাঠ ছাড়তে হয়। ফলে চিলি ও আর্জেন্টিনা দুই দলই ১০ জনে পরিণত হয়।

গোলশূন্য প্রথার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধে মরিয়া আক্রমণ শুরু করে আর্জেন্টিনা ও চিলি উভয় দলই। আর্জেন্টিনার সঙ্গে সমান তালে লড়াই করে চিলিয়ানরা। নির্ধারিত সময়ের খেলা গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলায়ও গোল করতে পারেনি কোনো দলই। ফলে টাইব্রেকারের গড়ায় ম্যাচ।

গত বছর কোপা আমেরিকার ফাইনালে টাইব্রেকারে চিলির কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। এবারও একই পরিণতি বরণ করতে হলো মেসিদের। টাইব্রেকারের রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপার শিরোপা ঘরে তোলে চিলি।

টাইব্রেকারে চিলির হয়ে প্রথম শটটি নিতে এসে মিস করে বসেন আর্তুরো ভিদাল। তবে তিনি গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় শিরোপার স্বপ্ন বুনতে থাকে আর্জেন্টিনা শিবির।

কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম শটটি নিতে এসেই মিস করে বসেন মেসি।  পোস্টের ওপর দিয়ে মাঠের বাইরে চলে যায় বল। ফলে নায়ক হওয়ার যেই মঞ্চ মেসির জন্য প্রস্তুত ছিল সেই মঞ্চেই খলনায়ক হলেন কিং লি।

আর্জেন্টিনার হয়ে মাসচেরানো ও সার্জিও আগুয়েরো গোল করলেও মেসির পর চতুর্থ শট নিতে এসে ব্যর্থ হন লুকাস বিগলিয়াও। ফলে চিলির হয়ে পঞ্চম শটটিকে গোলে পরিণত করে মেসিদের কাঁদিয়ে চিলিকে উৎসবে মাতান ফ্রান্সিসকো আন্দ্রেস সিলভা।

মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রথম মিনিটেই আক্রমণে যায় আর্জেন্টিনা। বাম প্রান্ত থেকে সতীর্থের বাড়ানো বল ধরে আক্রমণের দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন এভার বানেগা। তবে বানেগার নেয়া শটটি পোস্টের ওপর দিয়ে বাইরে চলে গেলে হতাশ হতে হয় আর্জেন্টিনাকে।

পঞ্চম মিনিটের মাথায় সানচেজ এবং ১১ মিনিটের মাথায় আরাঙ্গুয়েজ আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের ট্যাকলের শিকার হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে দুশ্চিন্তা ভর করে চিলিয়ান শিবিরে। তবে সেই ধাক্কা সামলে দুজনই ঠিকই খেলা চালিয়ে যান।

১৬তম মিনিটে গঞ্জালো হিগুয়েনের বাড়ানো বল ধরে কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার পথে মেসিকে ফেলে দেন মার্সেলো দিয়াজ। ফলে রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখাতে বাধ্য হন। ফ্রি-কিকে মেসির নেয়া দুর্বল শট রুখতে সমস্যা হয়নি চিলিয়ান গোলরক্ষক ক্লদিও ব্রাভোর।

২০তম মিনিটে বড় ধরনের ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা শিবির। মাঝমাঠ থেকে বল ট্রেডমার্ক দৌড়ে বল নিয়ে চিলির বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া। তবে চিলির এক খেলোয়াড়ের বাজে ট্যাকলের শিকার হয়ে পেশিতে টান পড়ে সদ্য ইনজুরি কাটিয়ে মাঠে ফেরা মারিয়ার। অবশ্য খুব দ্রুতই মানিয়ে নিয়ে খেলায় ফেরেন এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।

২৫তম মিনিটে গোলের উদযাপন প্রায় করেই ফেলেছিল আর্জেন্টিনা। ক্রস থেকে ভেসে আসা বলে আর্তুরো ভিদালকে ফাঁকি দিয়ে লাফিয়ে ওঠে দুর্দান্ত এক হেড নেন নিকোলাস ওতামেন্দি। পোস্টের পাশ দিয়ে বল জালে আশ্রয় নিলে গোল হয়েছে ভেবে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আর্জেন্টাইন দর্শকরা উৎসব শুরু করে দেন। যদিও তাদের ভুল ভাঙতে খুব একটা সময় লাগেনি।

তিন মিনিট পর বড় ধরনের ধাক্কা খায় চিলি। ২৮তম মিনিটে মেসিকে বাজে ট্যাকল করে ম্যাচে দ্বিতীয়বারের মতো হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন দিয়াজ। ফলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় চিলি।

প্রতিপক্ষ ১০ জনের দলে পরিণত হলেও প্রথমার্ধে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের পাশাপাশি দুই দলই শারীরিক ফুটবল খেলতে থাকে। এর ফলে ৩৮তম মিনিটে দুই দলের দুজন হলুদ কার্ড দেখেন। প্রথমে আর্জেন্টাইন তারকা হাভিয়ের মাসচেরানো এবং পরে চিলিয়ান ফরোয়ার্ড আর্তুরো ভিদাল হলুদ কার্ড দেখেন।

৪০তম মিনিটে প্রতিপক্ষের ট্যাকলের শিকার হয়ে মেজাজ হারিয়ে বসেন মেসি। ফলে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের ওপর অহেতুক মার্ক করে হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

তিন মিনিট পর বড় ধরনের ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। ৪৩তম মিনিটে ভিদালকে বাজে ট্যাকল করায় মার্কোস রোহাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। ফরে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনাও। যদিও লাল কার্ডের সিদ্ধান্তটি বাড়াবাড়িই মনে হয়েছিল।

প্রথমার্ধের বাকি সময়টুকু আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ ও শারীরিক সংঘর্ষে জমে উঠলেও কোনো দলই কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায়নি। ফলে গোলশূন্য ড্র নিয়ে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা ও চিলি।

বিরতির পরপরই গোলের জন্য মরিয়া আক্রমণ শুরু করে আর্জেন্টিনা ও চিলি। যদিও প্রথম সুযোগটি পায় চিলিয়ানরা। সতীর্থের বাড়ানো পাস ধরে বল নিয়ে আর্জেন্টিনার বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন সানচেজ। মার্কেডোর বাধা পেরিয়ে সানচেজ বুদ্ধিদীপ্ত পাস বাড়ান এডুয়ার্ডো ভারগাসের উদ্দেশ্যে। তবে রেফারি অফসাইডের বাঁশি ফুঁ দিলে বেঁচে যায় আর্জেন্টিনা।

৫৪তম মিনিটে ম্যাচে উত্তেজনা ছড়ায়। বল নিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সের ভেতরে ঢোকার মুখে ভিদাল ও হুয়ান বিউসেজারের বাজে ট্যাকলের শিকার হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মেসি। এই দুই চিলিয়ান খেলোয়াড়ই এর আগে ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখেন। ফলে দুজনের কেউই এই যাত্রায় হলুদ কার্ড দেখলে মাঠ ছাড়তে হতো। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা হলদু কার্ডের দাবিতে রেফারিকে ঘিরে ফেললেও তাতে কর্ণপাত করেননি রেফারি।

৫৭তম মিনিটে ডি মারিয়াকে মাঠ থেকে তুলে নিয়ে ম্যাতিয়াস ক্রানভিটারকে মাঠে নামান জেরার্ডো মার্টিনো। যদিও কোচের এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করতে করতে মাঠ ছাড়েন এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।

৬৫তম মিনিটে সানচেজ ও ফুয়েনজালিদার সমন্বয়ে দারুণ আক্রমণ শানায় চিলি। তবে অফসাইডের কারণে সেই প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয় চিলিয়ানদের।

৬৯তম মিনিটে বল নিয়ে আক্রমণে যান মেসি। তবে আরাঙ্গুয়েজের বাজে ট্যাকলের শিকার হয়ে মাটিতে পড়ে যান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ফলে রেফারি চিলিয়ান তারকাকে হলুদ কার্ড দেখান।

এরপর আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে খেলা চললেও গোলের পরিষ্কার সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয় দুই দল। ৮০তম মিনিটে অবশ্য চিলির দারুণ এক আক্রমণ ব্যর্থ করে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে উদ্ধার করেন গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো। সানচেজের পাস থেকে বল পেয়ে গোলমুখে দারুণ এক শট নিয়েছিলেন ভারগাস। তবে সেই শট দুর্দান্ত দৃঢ়তায় রুখে দেন রোমেরো।

এরপর একের পর এক আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে ম্যাচ জমে উঠলেও কোনো দলই নির্ধারিত সময়ে গোল করতে পারেনি। ফলে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গড়ায় শিরোপার লড়াই। এক বছর আগের ফাইনালেও নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে গড়িয়েছিল চিলি ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল।

অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলার শুরু থেকেই সমান তালে লড়তে থাকে আর্জেন্টিনা ও চিলি। ৯৩তম মিনিটে আরাঙ্গুয়েজ ও মেসি একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে যান। এসময় দুই দলের পক্ষ থেকেই হলুদ কার্ডের দাবি তোলা হলেও রেফারি তাতে সাড়া দেননি।

৯৯তম মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে আর্জেন্টিনা শিবিরে ভীতি ছড়িয়ে দেয় চিলি। বদলি হিসেবে মাঠে চিলিয়ান মিডফিল্ডার এডসন ওচ বক্সের ভেতরে বিপদসীমায় ক্রস বাড়ান। ক্রস থেকে ভেসে আসা বলে গোলমুখে দারুণ হেড নিয়েছিলেন ভারগাস। তবে দারুণ ক্ষিপ্রতায় সেই হেড রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিপদমুক্ত করেন গোলরক্ষক রোমেরো।

এক মিনিট পর চিলিকে রক্ষা করেন গোলরক্ষক ব্রাভো। আগুয়েরোর নেয়া দারুণ হেড স্পাইডারের মতো লাফিয়ে রুখে দেন এই চিলিয়ান গোলরক্ষক। এভাবে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের অর্ধেক পেরিয়ে যায়।

শেষ ১৫ মিনিটে আক্রমণের পাশাপাশি নিজেদের গোলপোস্ট সামলানোর দিকেও মনোযোগ দেয় আর্জেন্টিনা। ফলে আক্রমণের ধার কিছুটা কমে যায়।

১১৩তম মিনিটে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বক্সের কিছুটা বাইরে চিলিয়ান তারকা সিলভা মেসিকে ফেলে দিলে রেফারি ফ্রি-কিকের নির্দেশ দেন। এসময় আর্জেন্টিনা ও চিলির খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় হলে রেফারি উভয় পক্ষকে শান্ত করেন। এরপর কোনো গোল না হওয়ায় টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষায় গড়ায় ম্যাচ। যেখানে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নীল হয়ে মাঠ ছাড়েন মেসিরা।

এমএআই/কেআরএস