মেসিদের স্বপ্নপূরণ নাকি ফের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

ঢাকা, ২০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

মেসিদের স্বপ্নপূরণ নাকি ফের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

আরেফিন ইসলাম ৯:৩৭ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০১৬

মেসিদের স্বপ্নপূরণ নাকি ফের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

দীর্ঘ ২৩ বছরের প্রতীক্ষা। সেই ১৯৯৩ সালের পর এখনো বড় কোনো শিরোপা ছুঁয়ে দেখা হয়নি আর্জেন্টিনার। বেশ কয়েকবার শিরোপা জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার দেশ। তবে প্রতিবারই সঙ্গী হয়েছে চোখের জল; এক রাশ হতাশা। আক্ষেপ ছুঁয়ে গেছে ভক্তদেরও। বেশ কয়েকবার ফাইনালে গিয়েও আরাধ্য ট্রফিতে আর চুমু খাওয়া হয়নি। গত দুই বছরই দুবার ফাইনালে হেরে শিরোপা-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে মাঠ ছেড়েছিল লিওনেল মেসির দল। দুয়ারে আরেকটি মেজর টুর্নামেন্টের ফাইনাল। শিরোপা জিততে মরিয়া মেসির আর্জেন্টিনা। এবার হবে তো?

আর্জেন্টিনার হতাশার শুরু ১৯৯০ বিশ্বকাপে। সেবার ফেভারিট হিসেবে মাঠে নেমেও ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ফাইনালে জার্মানির কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে যায়। তিন বছরের ব্যবধানে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার আর্জেন্টিনা টানা দুবার কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে কিছুটা হলেও সেই ক্ষতে প্রলেপ দেয়। এরপর শুধু কান্না, বেদনা আর হতাশার প্রতিচ্ছবি নীল-সাদা শিবিরে। ১৯৯০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ছাড়াও ২০০৪ ও ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও হেরে যায় আলবিসেলেস্তে শিবির।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে 'সর্বকালের সেরা' খেলোয়াড় হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। শিরোপা উৎসবে মেতে ওঠার বেশ কয়েকটি সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি মেসি-হিগুয়েনরা। ফলাফল- মারিও গোটশের শেষ মুহূর্তের গোলে চোখের জলে মাঠ ছাড়েন মেসিরা। এক বছর পর কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে হতাশাকে সঙ্গী করেই মাঠ ছাড়ে আলবিসেলেস্তে শিবির।

এবার নতুন এক বছর। নতুন এক কোপা আমেরিকার ফাইনাল। নতুন মহাদেশে ফের মুখোমুখি একই প্রতিপক্ষ। দুর্দান্ত ছন্দে থাকা আর্জেন্টিনার সামনে আরেক দুর্দমনীয় দল চিলি। কোপা আমেরিকার শতবর্ষী টুর্নামেন্টের ফাইনালে প্রায় দুই যুগের শিরোপা খরা কাটানোর লক্ষ্যে মাঠে নামবে নীল-সাদা শিবির। বাংলাদেশ সময় সোমবার সকাল ছয়টায় নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচার করবে সনি ইএসপিএন।

আর্জেন্টিনা যেই দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে তাতে করে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখতেই পারে। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে চলতি বছরের শুরুর দিকে চিলির বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের জয় পায় মেসির দল। এরপর কোপার চলমান আসরের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মেসিকে ছাড়াই চিলিয়ানদের ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে জেরার্ডো মার্টিনোর দল। ফলে আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করেই মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা।

তবে আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই চিলিয়ান শিবিরেও। এক বছর আগে কোপার ফাইনালে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই শিরোপা জিতেছিল অ্যালেক্সিস সানচেজের দল। এছাড়া কোয়ার্টার ফাইনালে মেক্সিকোর মতো শক্তিশালী দলকে ৭-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেমিতে জায়গা করে চিলি। এরপর সেমিতে কলম্বিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকেট পায় দলটি।

২০১৪ বিশ্বকাপ ও গত বছরের কোপা আমেরিকায় দারুণ ফর্মে থাকা মেসি ফাইনালে এসেই যেন খেই হারিয়ে ফেলেন। এই ফুটবল জাদুকর শিরোপার লড়াইয়ে ‘ম্রিয়মাণ’ হয়ে পড়ায় খুব কাছে গিয়েও শিরোপা ছুঁয়ে দেখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। এবার সেই আক্ষেপ ঘোচানোর সুযোগ মেসি ও আর্জেন্টিনার সামনে।

অবশ্য আর্জেন্টিনার চেয়ে কোনো অংশে কম মরিয়া নয় মেসি। জাতীয় দলের হয়ে কোনো মেজর শিরোপা জিততে না পারায় নিন্দুকদের কম সমালোচনা শুনতে হয়নি পাঁচবারের ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারজয়ী এই তারকাকে। এবার শিরোপা জিতে অধরা ট্রফির আক্ষেপ ঘোচানোর পাশাপাশি সমালোচকদের মোক্ষম জবাব দেয়ারও সুবর্ণ সুযোগ পাচ্ছেন কিং লিও।

ফাইনালে নিশ্চিতভাবে মেসিকে কড়া পাহারায় রাখবে চিলি। তবে চলতি টুর্নামেন্টে ফ্রি-কিক থেকে চোখে লেগে থাকা কয়েকটি গোল করে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক চিলিকে বার্তা দিয়ে রেখেছেন, তাকে আটকে রেখে লাভ হবে না। জাদুকরি ড্রিবলিং, ট্রেডমার্ক দৌড় কিংবা দর্শনীয় ফ্রি-কিক দিয়ে এক ঝলকেই প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ম্যাচ বের করে আনবেন মেসি- সেই অপেক্ষায়ই রয়েছে আর্জেন্টাইন শিবির।

সোমবারের কোপা আমেরিকার শতবর্ষী টুর্নামেন্টের ঐতিহাসিক ফাইনালে আর্জেন্টিনার শিরোপা জেতা-না জেতা অনেকাংশেই মেসির ওপর নির্ভর করে। মেসির এক জাদুকরি মুহূর্তই আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিতে পারে। আবার আগের দুটি ফাইনালের মতো কিং লিও নিষ্প্রভ থাকলে ফের চোখের জলে মাঠ ছাড়তে হতে পারে নীল-সাদা শিবিরকে।

ফাইনালে ওঠার পথে চিলির চেয়ে অপ্রতিরোধ্য ছিল আর্জেন্টিনা। কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেমিতে চিলিয়ানদের জয় যেখানে ২-০ ব্যবধানের; সেখানে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে ফাইনালের টিকেট পায় মেসির দল।

টুর্নামেন্টে চার ম্যাচ খেলে ইতোমধ্যেই পাঁচ গোল করার পাশাপাশি চারটি গোলে অ্যাসিস্ট করেন মেসি। ফলে সোমবারের ফাইনালে শিরোপা জয়ের পাশাপাশি গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুটের লক্ষ্যেও মাঠে নামবেন তিনি। চিলিয়ান তারকা এডুয়ার্ডো ভারগাস ছয় গোল করে মেসির চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছেন। ফাইনালে যদি কিং লিও ভারগাসকে ছাপিয়ে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতাতে পারেন তবে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডেন বুটের পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বলও জয় করবেন তিনি।

আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়াকে নিয়ে। তবে চোট কাটিয়ে ফাইনালে ফেরার জন্য এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার সেরে উঠেছেন বলে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও কোচ মার্টিনোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অবশ্য ইনজুরির কারণে ফাইনাল থেকে ছিটকে পড়েছেন এজিকুয়েল লাভেজ্জি। তবে মেসি, ডি মারিয়া, সার্জিও আগুয়েরো ও গঞ্জালো হিগুয়েনের সমন্বয়ে অপ্রতিরোধ্য এক দল নিয়েই শিরোপার লড়াইয়ে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা।

ইনজুরি সমস্যা রয়েছে চিলিয়ান শিবিরেও। হাঁটুর চোটের কারণে পাবলো হার্নান্দেজ মাঠের বাইরে রয়েছেন। এছাড়া মিডফিল্ডার মার্সেলো দিয়াজের খেলা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আর্তুরো ভিদাল ফাইনালে ফেরায় চাঙা হয়েই মাঠে নামবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

মুখোমুখি লড়াইয়ে চিলির বিপক্ষে যোজন-যোজন এগিয়ে রয়েছে আর্জেন্টিনা। দুই দলের মধ্যকার ৮৭ বারের সাক্ষাতে ৫৮টি জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। চিলির ছয় জয়ের বিপরীতে ২৩টি ম্যাচ ড্র হয়। অবশ্য ফাইনালের মতো লড়াইয়ে এসব পরিসংখ্যান কোনো ধর্তব্যের মধ্যে আসে না।

একটি শিরোপার জন্য দুই, চার কিংবা দশ বছর নয়; ২৩টি বছরের অপেক্ষা আর্জেন্টিনার। বেশ কয়েকবার হাতছোঁয়া দূরত্বে গিয়েও শিরোপা হাতছাড়া করে চোখের জলে মাঠ ছাড়ে নীল-সাদা শিবির। এবার কি মেসিদের স্বপ্নপূরণ হবে নাকি ফের বেদনার রঙে নীল হবে আর্জেন্টাইন শিবির সেটি জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে বাংলাদেশ সময় সোমবার সকাল পর্যন্ত।

এমএআই/এটি

 

খেলাধুলা: আরও পড়ুন

আরও