শুভবোধ জাগিয়ে তুলি এ রমজানে

ঢাকা, ১৭ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

শুভবোধ জাগিয়ে তুলি এ রমজানে

মেহেদি রাসেল ৭:০১ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৬

শুভবোধ জাগিয়ে তুলি এ রমজানে

এই আমাদের দেশ। এখানে আমরা অনিয়মকেই নিয়ম বানিয়ে ফেলি। কেউ নিয়ম মানলেই বরং ফলাও করে খবরের কাগজে ছাপা হয়। লোকে বাহবা দেয়। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এখানে খুব নৈমিত্তিক ব্যাপার।

কাউকে আপনি জিজ্ঞাসা করে দেখেন সে কেন ঘুষ খায়, উত্তর দেবে চাকরি নেওয়ার সময় প্রচুর টাকা দিতে হয়েছে ফলে এখন সে ঘুষ খেয়ে সেটি উসুল করবে। সরল যুক্তি। অনেকটা অধিকারের মতো যেনো। ওজনে কম দেওয়া, পণ্য মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানো, ১০০ টাকায় কিনে ৫০০ টাকায় বিক্রি করা, খাবারে বিষাক্ত রাসায়নিক দেওয়া এগুলো এখানে ডালভাত। তাই, এ রমজানে টেলিভিশনের খবরে ফলে ফরমালিন না পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি কিছুটা হলেও বিস্মিত করেছে আমাদের। রোজার মাসে কি আমরা তবে ইসলামি মূল্যবোধকে জাগিয়ে তুলতে পারছি কিছুটা হলেও?

ইসলাম শান্তি আর সহমর্মিতার ধর্ম। ইসলামের অনুসারীদের জন্য রোজা রাখা ফরজ বা অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। মুসলমানেরা রোজা রাখবেন যেন তারা অভাবী মানুষের কষ্ট বুঝতে পারেন। যেন তারা সহমর্মী হয়ে উঠতে পারেন। রমজান মাসকে বলা হয় সংযমের মাস। কিন্তু আমরা কি আদৌ সেটার চর্চা করি? নাকি ভোজনবিলাসে মত্ত হয়ে প্রকারান্তরে একটি উৎসবের মাস বানিয়ে ফেলি একে? প্রশ্নটা সামনে এসে যায় যখন রোজার মাসকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়।

ইসলামের নবী হজরত মুহম্মদ (স.) নিজে ব্যবসা করতেন। পেশা হিসেবে তাই ব্যবসায়ের মর্যাদা অনেক। সৎ ব্যবসায় সম্পর্কে কোনো কোনো হাদিসে বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন সৎ ব্যবসায়ীরা শহীদের সঙ্গে থাকবেন। অপরদিকে, অসৎ উপার্জনকারীর ইবাদত কবুল হয় না। ফলে, ধর্মীয় এবং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবসায়ে সততা বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোকের ধর্ম ইসলাম। ঢাকা শহরকে বলা হয় মসজিদের শহর। অথচ আমাদের দেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী রমজান এলেই বেআইনিভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন। কোনো কোনো দরকারি জিনিসের দাম এমনকি ৫ গুন পর্যন্ত বেড়ে যায়। অথচ চাহিদা ও জোগানের অনুপাত কিন্তু অসম নয়। বাজারে সমস্ত কিছুরই সরবরাহ প্রচুর। শুধু দামটাই চড়া। ফলে, বিত্তবানরা যথেষ্ট জৌলুসপূর্ণভাবে রমজান মাস কাটান, আর অন্যদিকে গরিব লোকেরা খুব কষ্টে দিন গুজরান করেন। টেলিভিশনে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় আহারের চিত্র যেমন আসে, তেমনি ভাঙা ঘরে বসে পান্তা দিয়ে ইফতারের চিত্রও আসে।

যদিও এই ভেদাভেদ কমানোর জন্য একটি মাস রোজা রাখার বিধান রাখা হয়েছে ইসলামে, কিন্তু রোজার মাসে যেন ভেদাভেদ আরও বেড়ে যায়। সরকার থেকে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সুলভ মূল্যে বিক্রি করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে নিম্নবিত্ত মানুষকে এসব পণ্য নিতে দেখা যায়। অথচ মুসলমানরা যদি রমজানের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করতেন তাহলে এমন দৃশ্য দেখা যেত না।

বাজারেই সকল শ্রেণির মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি ন্যায্যমূল্যে পেয়ে যেতেন। সেটি হয় না বলেই সরকারকে এমন উদ্যোগ নিতে হয় রোজার মাসে। তবে, এই উদ্যোগ নেওয়ার চেয়ে সরকার যদি বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করত সেটাই বেশি ফলপ্রসূ হতো। এমন উদ্যোগের হয়তো দরকারই হতো না।

ফি-বছর, যেভাবে আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হয়, তাতে যে কারও এটা মনে হওয়ায় সঙ্গত যে, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সরকারের চেয়ে শক্তিশালী! বাজার সম্পর্কিত সরকারের নীতিমালা খুব একটা কার্যকর হয় বলে মনে হয় না। গণমাধ্যমে রোজার মাসে নানা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করার খবর পাওয়া যায়। কিন্তু এরপরও কেনো ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া? সম্ভবত জরিমানার অঙ্কটি খুব বেশি নয়। তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কারণে জরিমানা দেওয়ার পরও তারা একই কাজ করেন।

খাবার দোকানগুলো রোজার মাসে দিনের বেলায় সাধারণত বন্ধ থাকে। হয়তো এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য দোকানগুলোতে ইফতারের আইটেমগুলো অধিক দামে বিক্রি হয়। প্রায়শই সেগুলো স্বাস্থ্যকরও হয় না। পোড়া তেলে ভাজা হয় ইফতারের নানা পদ। ইদানীং ঢাকার দোকানগুলো ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে সেহরীর আয়োজনও করছে। বিগত কয়েক বছর ধরে এটি চলছে। এখানেও সরকারের নজরদারি কম। কয়েকটি হোটেল সম্পর্কে অভিযোগ উঠেছে বাসি খাবার খাওয়ানোর।

রোজার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, রমজাননির্ভর প্রতিটি পণ্যেরই আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য কমেছে। চাহিদার তুলনায় বেশি পণ্য মজুত করা হয়েছে। এরপরেও কেনো দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না সেটাই কেবল বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। এই স্বীকারোক্তি যেমন দুঃখজনক তেমনি হাস্যকরও বটে। হাস্যকর এ কারণে যে, সরকারের সঠিক পদক্ষেপ ও সমন্বয় নেই। সরকারের অসহায় রূপও এর মাধ্যমে ফুটে ওঠে।

২০১৫ সালে বিবিসির এক রিপোর্টে দেখা যায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই-এর একজন পরিচালক বলেন, 'বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনীতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে তেরো লাখ কোটি টাকা। আর শুধু রোজার মাসেই সার্বিক অর্থনীতিতে যোগ হয় সোয়া এক লাখ কোটি টাকা।' ওই একই রিপোর্টে সিপিডির ড. মোয়াজ্জেম বলেছেন, 'এ সময় অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য তৈরি হলেও তার সুফল সার্বিক অর্থনীতিতে ততটা যোগ হয় না।

কারণ এ সময় একটা অতি মুনাফার প্রবণতা থাকে মুনাফা বাঁটোয়ারা হয় অল্প কিছু মানুষের মধ্যে। আর এর প্রবণতা দেখা যায় শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক'। লক্ষণীয় হলো, ড. মোয়াজ্জেম অর্থনৈতিক এই প্রবণতাতে বলছেন 'চাঞ্চল্য', আর তিনি ব্যবহার করেছেন 'অতি মুনাফা' শব্দবন্ধটি। ২০১৫ সালের তুলনায় এবারের পরিসংখ্যান কিছুটা ভিন্ন হবে বলাই বাহুল্য, তবে সামগ্রিক চরিত্র কিন্তু একদমই বদলায়নি।

রমজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ঈদ বাজার জমে ওঠে। ভিড়ের ভয়ে অনেকেই প্রথম দিকেই কেনাকাটা সেরে ফেলেন। ঈদের বাজারে রীতিমতো হরিলুটের কারবার চলে প্রতিবছর। এখানেও সরকারের নজরদারি প্রায় শূন্য। ব্যবসায়ীরা সারা বছরের লাভ যেন করে রাখতে চান এ মাসেই। ফলে তিন/চার গুন বেশি দামে পণ্য বিক্রি করেন তারা। কোনো জবাবদিহি কিংবা স্বচ্ছতার বালাই নেই। উৎসব উপলক্ষে এমন অরাজকতার উদাহরণ বোধ করি সারা দুনিয়ায় আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

এই রমজানে চট্টগ্রামে মিমি সুপার মার্কেটের 'ইয়াং লেডি' নামক দোকানে ৬ হাজার ৯৯৫ টাকায় কেনা একটি পোশাক বিক্রি করা হয়েছে ১৯ হাজার ৫০০ টাকায়। এটি একটি উদাহরণ। এ রকম নৈরাজ্য পোশাকের বাজারে সারা রোজার মাস জুড়েই চলতে থাকে। ইসলাম এ রকম অতি মুনাফা সমর্থন করেন। উপরন্তু আমরা যদি রোজার মাসে সংযমের কথা বিবেচনা করি তবে এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

মাঝে মাঝেই লোক ঠকানোর অভিনব কৌশল আবিষ্কার করেন আমাদের ব্যবসায়ীরা, যেমন বরফের মধ্যে মাংস রেখে ওজন বাড়িয়ে বিক্রি করছে এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী।(খবর : প্রথম আলো অনলাইন) সেটিও এ রমজান মাসে। ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধ কোথায় গিয়ে ঠেকলে এ রকম কাজ করা যায়? আসুন অন্তত রোজার মাসে আমরা আমাদের শুভবোধ জাগিয়ে তুলি। প্রকৃত ইসলামকে আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে পালন করি।

রোজা শুধুমাত্র না খেয়ে থাকা নয়। রোজার অর্থ হলে একজন মানুষের সামগ্রিক সংযম। সৎ থাকা এবং অন্যায় থেকে বিরত না থেকে প্রকৃত রোজা পালন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

মেহেদি রাসেল : সাংবাদিক, গল্পকার ও কলামিস্ট।
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও