বাঁশঝাড়ে-পাটক্ষেতে লুকিয়ে দিন কাটছে মুক্তিযোদ্ধাদের

ঢাকা, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

বাঁশঝাড়ে-পাটক্ষেতে লুকিয়ে দিন কাটছে মুক্তিযোদ্ধাদের

জেলা প্রতিনিধি ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৬, ২০১৬

বাঁশঝাড়ে-পাটক্ষেতে লুকিয়ে দিন কাটছে মুক্তিযোদ্ধাদের

মাগুরার শ্রীপুরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবারের সদস্যরা নিজ দেশে ‘পরবাসী’ হয়ে পড়েছেন। সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশ প্রশাসনের রোষানলের শিকার হয়েছেন তারা। তাদের অনেককে দিনে বাঁশঝাড়ে আর রাতে পাটক্ষেতে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শ্রীপুর বাহিনীপ্রধান মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন ছিলেন এই ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান। তার উত্তরসূরি হিসেবে স্থানীয় মানুষের ভোটে বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন ছেলে কুতুবুল্লাহ হোসেন কুটি। সেই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে তার কাছে পরাজিত হন। এ বছরের গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মুতাসিম বিল্লাহ সংগ্রামকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন সাবেক চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা কুতুবুল্লাহ (আনারস মার্কা)। যে কারণে তার সমর্থিত আওয়ামী লীগ কর্মীরা এখন নিজ দলের রোষানলে পড়েছেন। শুধু তাই নয় সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন নিয়ে স্থানীয় ‘বিএনপি কর্মী ও নব্য আওয়ামী লীগ কর্মী’ হিসেবে চিহ্নিতরাও তাদের বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে শ্রীকোল ইউনিয়নের খামারপাড়া, শ্রীকোল, বারইপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে প্রতিপক্ষের হামলা, মামলা ও পুলিশি ধরপাকড়ের ভয়ে তটস্থ মানুষদের দেখা মেলে। দুপুর খাঁ খাঁ রোদ। সারাগ্রাম পুরুষশূন্য। অধিকাংশ বাড়িই পাহারা দিচ্ছে অল্প বয়সী শিশু ও বৃদ্ধা। তাদের দেওয়া তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে খামারপাড়া গ্রামের একটি বাঁশবাগানের মধ্যে দেখা মেলে শতাধিক পুরুষের। স্কুল ছাত্র থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন সেখানে। সকলের চোখে মুখে ভয়। এদের মধ্যে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন জোয়ারদার, কাজি তৈয়বুর রহমান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তারিকুল ইসলাম হিটলারও রয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন জোয়ারদার বলেন, আমাদের একটাই অপরাধ আমরা কেন মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেনের পরিবারের সঙ্গে রাজনীতি করি। আমাদের একটাই অপরাধ আমরা কেন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কুটিকে সমর্থন দিয়েছি। সেই অপরাধে আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে পুলিশকে দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।

সুনসান নীরব বাঁশবাগানে লুকিয়ে থাকা অপর মুক্তিযোদ্ধা কাজি তৈয়বুর রহমান বলেন, আমরাও আওয়ামী লীগ করি। কিন্তু স্থানীয় অনেক বিএনপি-জামায়াতের লোকজন বিগত নির্বাচনের সময়ে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়েছে। তারা আজ সুবিধাবাদী আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সমর্থন নিয়ে আমাদের উপর অত্যাচার করছে। তাদের অত্যাচারে এবং পুলিশি নির্যাতনের কারণে আমরা দিনেও বাড়িতে থাকতে পারি না। আবার রাতের ঘুমাতে পারি না।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তারিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পর নৌকা মার্কা প্রার্থীর পক্ষে শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খোন্দকার আশরাফের লোকজন আমার বাড়িঘর ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়েছে। আবার আমার নামেই ১৫টি মিথ্যা মামলা দিয়েছে। এখন পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্য যে, একাত্তরেও এত খারাপ পরিবেশ ছিল বলে মনে হয় না।

খামারপাড়া ও শ্রীকোল গ্রাম ঘুরে প্রতিপক্ষের হামলায় বিধ্বস্ত অন্তত ৫০টি বাড়িঘর দেখা যায়। সেখানে অবস্থানরত নারীরা তটস্থ কখন না জানি আবার নতুন করে হামলা হয়।

শ্রীকোল গ্রামের গৃহবধূ নবুয়ত শেখের স্ত্রী খোদেজা বেগম বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দুই মাস আগে টিনের ঘর করেছি। কিন্তু নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট না দেওয়ায় তারা কুপিয়ে আমার ঘর তছনছ করে ফেলেছে। আমার মেয়েটির সামনে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। কিন্তু তাদের ভয়ে মেয়েকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দিতে হয়েছে। আমাদের টাকাপয়সা নাই। আমাদের জন্য কোনো আইনও নেই। নিজ গ্রামেই আমরা পরবাসী হয়ে গেছি। কিছুদিন আগেও যেসব বিএনপি কর্মীরা নাশকতার মামলা নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে তারা আজ পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করছে।

একই গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধা কোহিনূর বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার চার ছেলে মুক্তিযোদ্ধা। অথচ স্বাধীনতা বিরোধী এবং বিএনপির লোকজনের ভয়ে তারা বাড়িঘর ছেলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শ্রীপুর উপজেলার শ্রীকোল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে চলা তাণ্ডব এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নামে মামলা ও হামলার বিষয়ে মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ কুন্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, স্থানীয় লোকজনের দেওয়া এসব অভিযোগ সত্য নয়। বরং সাবেক চেয়ারম্যান কুতুবুল্লাহর ইন্ধনে তার লোকজন আওয়ামী লীগ কর্মীদের উপর হামলা করেছে। যে কারণে তারা প্রতিবাদ জানাতে পারে। তবে সেখানে বিএনপির কর্মীদের অংশগ্রহণ আছে কিনা জানি না।

তবে আওয়ামী লীগ নেতার এই বক্তব্যকে সত্যের অপলাপ বলে উল্লেখ করেছেন বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী যুবলীগ নেতা কুতুবুল্লাহ হোসেন কুটি। তিনি বলেন, শ্রীপুর থানার ওসি এক সময় বিএনপির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রশ্রয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোর উপর নির্যাতন চালাচ্ছেন।

মাগুরা পুলিশ সুপার একেএম এহসান উল্লাহ বলেন, বিগত ইউনিয়ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শ্রীকোল এলাকায় বেশকিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত থাকায় সেখানে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী ঘটনার সৃষ্টি হয়নি। তবে সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য সেখানকার পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এবিএ/আরআর/এমডি