এইচপিকে জাতীয় দলের সিঁড়ি ভাবছেন সাইফুদ্দিন-মিরাজরা

ঢাকা, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

এইচপিকে জাতীয় দলের সিঁড়ি ভাবছেন সাইফুদ্দিন-মিরাজরা

মুহাম্মদ মেহেদী হাসান ৮:০৭ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০১৬

এইচপিকে জাতীয় দলের সিঁড়ি ভাবছেন সাইফুদ্দিন-মিরাজরা

লাল-সবুজের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় দলের জার্সিটা এরইমধ্যে কারো কারো গায়ে উঠেছে, কেউ সেটা গায়ে চড়ানোর দরজায় টোকা দিয়ে রাখছেন, অনেকে জানান দিয়ে রাখছেন নিজের আগমনী বার্তাটা। নিঃসন্দেহে আগামী দিনের ক্রিকেটে তাদের মধ্য থেকেই বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবেন অনেকে। এমন সম্ভাবনাময় ২৪ তরুণকে নিয়েই এবার বসতে যাচ্ছে আগামীর ক্রিকেটারদের ঘষামাজা করে গড়ে তোলার কার্যক্রম। যার নাম হাই-পারফরমেন্স (এইচপি) ইউনিট।

এইচপি ইউনিটের কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) শনিবার ২৪ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে। যাতে জাতীয় দলের দরজায় টোকা দিতে থাকা ক্রিকেটাররা থেকে শুরু করে ঘরের মাটিতে হওয়া গত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ও ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফর্ম করা তরুণরা সুযোগ পেয়েছেন।

উঠতি ক্রিকেটারদের ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংসহ বিভিন্ন বিভাগে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এইচপি ক্যাম্পে। একটা ধাপে টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হবে, আরেকটা ধাপে ম্যাচ কন্ডিশনে খেলোয়াড়রা কীভাবে টেকনিকগুলোকে ব্যবহার করছেন তা মূল্যায়ন করে দুর্বলতা ধরিয়ে দেয়া হবে। সেজন্য আলাদা আলাদা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কাজ করবেন তরুণ টাইগাররা। যার প্রধান হিসেবে অস্ট্রেলিয়ান কোচ সাইমন হেলমটকে নিয়োগ দিয়েছে বিসিবি।

সাধারণত এইচপি ক্যাম্প থেকেই আগামীর সাকিব-তামিমদের গড়ে ওঠার রসদ বাগানো হয়। এখান থেকেই জাতীয় দল বা ‘এ’ দলের খেলোয়াড় বাছাই করে থাকে বিসিবি। ক্যাম্পের সদস্যদের নির্বাচন প্রক্রিয়াটাও তাই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচকদের নজর কাড়তে তাই বিশেষ কিছু করেই এইচপি ক্যাম্পে সুযোগ পেতে হয়। কিন্তু যারা ইতোমধ্যেই জাতীয় দলের জার্সিটা গায়ে চড়িয়েছেন, নিজেদের আরো খানিকটা শানিয়ে নিতে তাদের জন্যও এই ক্যাম্প যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পেসার আবু হায়দার রনিও পরিবর্তন ডটকমকে সেটাই মনে করিয়ে দিলেন।

গত বিপিএলে চমক জাগানিয়া পারফরমেন্সের পর দ্রুতই জাতীয় দলের দরজাটা খুলে গেছে রনির জন্য। খেলে ফেলেছেন ৫টি টি-টুয়েন্টি। ছিলেন ছোট দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটের গত বিশ্বকাপের টাইগার দলেও। এরপরও রনির কাছে এইচপি ক্যাম্পের গুরুত্ব কমছে না। নিজেকে লম্বা রেসের ঘোড়া হিসেবে গড়ে তুলতে ২০ বর্ষী এই তরুণ পেসার পুরনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে যোগ করতে চান এইচপি থেকে পাওয়া বিশেষ অভিজ্ঞতাও।

রনি অবশ্য এইচপির সর্বশেষ ক্যাম্পেও ছিলেন। সেখানে রিচার্ড ম্যাকিন্সের কাছে শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এবার হেলমটের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ। তবে সব ছাপিয়ে রনির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পুরনো গুরু সারওয়ার ইমরানের কোচিং পাওয়াটা। নিজের বর্তমান অবস্থানের পেছনে সারওয়ার স্যারের অনেক অবদান আছে জানিয়ে রনি পরিবর্তন ডটকমকে জানালেন, 'পুরনো গুরুর সঙ্গে কাজ করে নিজের টেকনিক্যাল দিকটি আরেকধাপ এগিয়ে নিতে চেষ্টা করবো আমি। তাছাড়া দীর্ঘ সময় জাতীয় দল বা ঘরোয়া ক্রিকেট না থাকায় এইচপি ক্যাম্প ফিটনেস ধরে রাখতেও সাহায্য করবে। সঙ্গে নতুন নতুন সতীর্থদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ড্রেসিংরুম শেয়ার করে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন আর সিনিয়রদের কাছ থেকে বাড়তি কিছু শিখতে চাইবো।'

তবে সদ্যগত ডিপিএলে অসাধারণ পারফর্ম করে সবার নজর নিজের দিকে ফেরাতে বাধ্য করা আল-আমিনের কাছে এইচপি ক্যাম্পটি আরো বিশেষ কিছু। ২০১২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সদস্য ২২ বর্ষী এই তরুণ দীর্ঘদিন আলোচনার বাইরেই ছিলেন। তবে প্রায় সাতশর কাছাকাছি রান ও ১৬ উইকেট নিয়ে নতুন করে আলোচনায় তিনি। এইচপি ক্যাম্পকে 'এ' দল বা জাতীয় দলের পূর্ব ধাপ হিসেবেই দেখছেন আল-আমিন। পরিবর্তন ডটকমকে জানালেন, ‌'ব্যাটে-বলে রানেই আছি। ডিপিএলের সময়টা ভালো কাটায় এইচপিতে সুযোগ মিলেছে। এখানে তিন মাসের ক্যাম্প। নিজের ঘাটতিগুলো নিয়ে কাজ করে উন্নতির সুযোগটা কাজে লাগানো সম্ভব।'

বিসিবির অধীনে এরকম কোন ক্যাম্পে যেহেতু আগে কখনো সুযোগ মেলেনি, এবারের সুযোগটির সর্বোচ্চ ব্যবহারই করতে চান আল-আমিন। পরিবর্তন ডটকমকে জানালেন, 'স্বপ্নটা সুদূরের হলেও লক্ষ্যটা কাছের জিনিসের দিকেই স্থির রাখতে চাই। নিজেকে আরেকটু ঘষেমেজে নিলে 'এ' দল ঘুরে হয়তো জাতীয় দলের সুযোগটাও ধরাছোঁয়ার মধ্যে চলে আসবে। তবে সেজন্য তো নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করা চাই প্রথমে। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং'সহ সব বিষয়েই নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে তাই প্রস্তুত থাকতে চাই।

অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তারকা অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের জন্য চ্যালেঞ্জটা একটু অন্যরকম। বাংলাদেশ দল বরাবরই একজন খাঁটি পেস-অলরাউন্ডারের অভাববোধ করে এসেছে। সেদিক থেকে ১৯ বছর বয়সী এই তরুণের মাঝে অপার সম্ভাবনা দেখেন ক্রিকেটবোদ্ধারা। তবে চোটের সঙ্গে সমঝোতা করতে হওয়ায় সদ্যগত ডিপিএলে বেশকিছু ম্যাচ হাতছাড়া হয়েছে। বয়সভিত্তিক দলের পর নিজেকে আরো বেশি করে চেনাতে তাই ডিপিএলকে কাজে লাগাতে পারেননি। তবে পরিবর্তন ডটকমকে জানালেন, 'এইচপিতে যখন সুযোগ মিলেছে, সেই ঘাটতিটা পুষিয়ে নিতে তিন মাসের এই ক্যাম্পকে কাজে লাগাতে চাই। ক্রিকেটের সব বিভাগেই নিজেকে অপরিহার্য করে গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য। জাতীয় দল তারকাসহ অনেক সিনিয়রকে সতীর্থ হিসেবে পাবো এইচপিতে। মূলত কোচ-সতীর্থ সবার কাছ থেকেই শিখতে চাই আমি। বড়দের ড্রেসিংরুমের আবহটা বুঝতেও কাজে লাগাতে চাই এই ক্যাম্পিং।'

এইচপি ক্যাম্পে অবধারিতভাবেই যার জায়গা মেলার কথা ছিল তিনি মেহেদি হাসান মিরাজ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সম্ভাবনাময় তরুণদের মধ্যে ১৮ বর্ষী এই তারকার মাঝে টাইগার ক্রিকেটের জিওনকাঠি মাশরাফি বিন মুর্তজার ছায়া দেখেন ক্রিকেটবোদ্ধারা। ব্যাটে-বলে নিজের আগমনী সময়টাতে সঠিক পথেই আছেন মিরাজ। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক বয়সভিত্তিক কোটা সাফল্যের সঙ্গে শেষ করার পর ঘরোয়া ক্রিকেটেও নিজের জাত চেনাচ্ছেন। এবার সেটা লম্বা রেসের ঘোড়া বানানোর পালা! এইচপি ক্যাম্পকে তারই একটি ধাপ হিসেবে দেখতে চান তিনি।

মিরাজ পরিবর্তন ডটকমকে জানালেন, 'জাতীয় দলের দরজাটা খোলার জন্য পারফরমেন্সটাই আসল। সেই পারফরমেন্সের সঙ্গে নিজেকে সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখাটাও জরুরী। কারো মাঝে অপার সম্ভাবনা থাকতে পারে, কিন্তু সেটাকে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। এইচপি ক্যাম্পে নিজেকে পরিপূর্ণ করে গড়ে তোলার সেই সঠিক কাজটাই করতে চাই।'

জানালেন, 'ছয় মাস খেলে ছয় মাস হারিয়ে যাওয়া ক্যারিয়ার কেউ চায় না। তাই পরিপূর্ণ প্রস্তুতিটা না থাকলে ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেটা ঠেকাতে এইচপি ক্যাম্পের মত সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে চাই।' ক্যাম্পে ডাক পাওয়াটা তাই স্বস্তিই দিয়েছে মিরাজকে। স্বস্তিটা লুকানোর চেষ্টাও করেননি এই তরুণ টাইগার। অনূর্ধ্ব তকমা থেকে বের হওয়ার জন্য এমন একটা কার্যক্রম যে বেশি করেই চাইছিলেন তিনি। এখন এইচপি থেকে শতভাগ সুবিধা আদায়ের প্রত্যয় তার। যেটা আগামী দিনের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে বলে মনে করছেন মিরাজ। প্রায় জাতীয় দলের সুযোগ-সুবিধায় পরিচালিত এমন একটি ক্যাম্প যে তাকে জাতীয় দলের স্বপ্নের দরজাটাই হাতছানি দিচ্ছে।

উল্লেখ্য, তিনজন টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যান, পাঁচজন মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান, তিনজন অলরাউন্ডার, চারজন স্পিনার, সাতজন পেসার ও দুজন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানের সমন্বয়ে গড়া এইচপি স্কোয়াড ক্যাম্পেইন শুরু করবে আগামী ১৭ জুলাই থেকে।

এমএইচ/এটি