দেশপ্রেম বনাম সার্বভৌমত্ব 

ঢাকা, সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯ | ৩ আষাঢ় ১৪২৬

দেশপ্রেম বনাম সার্বভৌমত্ব 

ড. ইশা মোহাম্মদ ৮:২২ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৬

দেশপ্রেম বনাম সার্বভৌমত্ব 

প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেম শুধুই কাছেই টানে, দূরে হঠায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলি কি দেশ প্রেমিক? যদি দেশপ্রেমিকই হয়, তারা পরস্পরকে কাছে টানে না কেনো? বাংলাদেশে শঙ্খচিলের নজর পড়েছে। হায়েনারা তেড়ে আসছে। নবাব সিরাজ বেঁচে থাকলে হয়ত বলতেন, বাংলার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা। কিন্তু শেখ হাসিনার সে কথা বলার সুযোগ নেই। তাছাড়া তিনি নবাবের মত অত অসহায় নন। তার পক্ষে দুর্যোগ উতরে যাওয়া সম্ভব। তবে বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে অগ্রসর হতে হবে।

সমস্যার ধরণ আর সমস্যার উত্তরণের মধ্যে পারম্পররর্যে আছে। এখন যে সমস্যা সামনে দাঁড়িয়েছে, তা থেকে বাঁচতে জাতীয় ঐক্য দরকার। বাংলাদেশে অনেকগুলি রাজনৈতিকদল পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা ও স্বাতন্ত্রিকতা বজায় রেখে রাজনীতি করছে। এদের মধ্যে কয়েকটি বাদে আর সবাইকে মোটাদাগে দেশপ্রেমিক দলই বলা যায়। কতগুলি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল নিয়ে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য একটি জাতীয় সংগ্রাম ও প্রতিরক্ষা পরিষদ তৈরী করা যায়।

জাতীয় দুর্যোগের বিষয়টি আর কেবলমাত্র রাজনীতির মধ্যে রাখলে চলবে না। সমাজের মধ্যেও নিতে হবে। সমাজের অসংখ্য মানুষ জনকে দেশ বৈরীরা ব্রেন ওয়াশ করে দেশ বৈরী বানিয়েছে। যারা এখনও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়নি, অর্থাৎ যাদের মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে যায়নি, তাদের মাথা মেরামত করে আবার দেশপ্রেমিক বানানো যায়। যদিও দেশ ভাগ হয়ে গেছে, তবুও ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব। জাতীয় ঐক্যের ডাক দিতে হবে। রাজনৈতিক এবং সামাজিক উভয়ত।

যৎসামান্য বিগড়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ যে মেরামতের পর ভাল পথে আসে তার প্রমাণ তো মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ই পেয়েছে। অনেক রাজাকারই মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ঐক্য করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই যুদ্ধ করেছে। বিশ্বাস না হলে যারা জীবিত আছেন, সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন, কথাটা সত্য না মিথ্যা, ঐ উদাহরণ সামনে রেখে দেশপ্রেমিক নেতৃত্বকে অগ্রসর হতে হবে। সামান্য লাইনচ্যুতদেরকে আবার পথে আনতে হবে। বাংলাদেশে অসংখ্য গরীব ঘরের ছেলে মেয়েরা মাদ্রাসায় পড়ে এবং দেশ বৈরীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের আজ্ঞাবহ হয়েছে। খুব সহজেই এদেরকে চিহ্নিত করা যায় এবং সৎপথে আনা যায়।

দেশ ভাগ হয়ে গেছে। জোড়া লাগাতে হবে। খু্বই স্বল্প জনসংখ্যা কখনই কাছে আসবে না। তারা দূরে দূরে থাকবেই। বাদ বাকীদের বুঝিয়ে সুজিয়ে প্রয়োজনে ধরে বেঁধে আনা সম্ভব। একবার ঢেউ উঠলে তার তোড়ে অনেক কিছুই ভেসে যায়। দেশ বৈরীদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। দেশ ভাগ হয়েছে বটে, কিন্তু তার কোনো সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না।

বাংলাদেশে ইহুদীদের দৃষ্টি পড়েছে। তারা মিজোরামের অববাহিকা ধরে পুরো অঞ্চলকে নিজেদের করে নেবে। বাংলাদেশ ঐ নতুন ভূ-খন্ডের জন্য খুবই প্রয়োজন। কেননা, বাংলাদেশে সমুদ্রে আছে। ভবিষ্যতের রাষ্ট্র সমুদ্রহীন হলে অকার্যকর কিংবা নির্ভরশীল হবেই। কোনো রাষ্ট্রই বিনা স্বার্থে সমুদ্র ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু সবলের জন্য সবই সম্ভব। বাংলাদেশ সন্নিহিত সমুদ্র গরীবের সুন্দরী বউ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সে কারণে দখল হয়ে যাওয়ার আগেই প্রতিরক্ষার বেষ্টনী দিতে হবে।

যদি ভালভাবে প্রচার করা যায় যে বিএনপি বাংলাদেশে ইহুদী রাজনীতি করছে তবে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে মুসলিম সমাজ তাদেরকে ঘৃণা করার সাথে সাথে মৌলবাদী জঙ্গি এবং তাদের মূল রাজনৈতিক দল, জামায়াতকেও ঘৃণা করবে। ইহুদীরা তাদের যোগ্য পুতুল না পাওয়া পর্যন্ত হামলে পড়বে না।

বাংলাদেশে ইহুদী বিদ্বেষী, দেশ বৈরী বিদ্বেষী প্রবল গণজাগরণ দেখা দিলে তারা ক্ষণকাল হলেও খামোশ হয়ে যাবে। এটাকে সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। আসাম বিজেপির অধীনে গেছে। এর অর্থ আসামে প্রচুর ইহুদী পুঁজি বিনিয়োগ করা হবে। ঐ বিনিয়োগকৃত পুঁজির একাংশ বাংলাদেশে নৈরাজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হবে। অবৈধ পুঁজির আগমন বন্ধ করতেই হবে। বিশেষ করে এনজিও পুঁজির চালান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। অনেক এনজিও ওয়ালা ইতোমধ্যেই ইহুদী পুঁজি দ্বারা সংক্রমিত। তাদেরকে নিরাময় করা দরকার। তাদের অবৈধ অর্থ সম্পদের ভার লাঘব করলেই তাদের বিষ নেমে যাবে। তারা অন্যদেরকে আর বিষাক্ত করতে পারবে না। বিষদাত ভাঙ্গার সহজ উপায় কি?

পাঁঠা কুঁদে খুঁটির জোরে। ইহুদীবাদীদের মূল খুঁটি পাকিস্তান। যদিও সাধারণ দৃষ্টিতে পাকিস্তানকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র মনে করা হয়, কিন্তু প্রকৃত অর্থে পাকিস্তান ইহুদীদের টাকায় পরিচালিত একটি ভ্রষ্টরাষ্ট্র। ইহুদীরা ভ্রষ্টরাষ্ট্রই পছন্দ করে। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন কোনো মুসলিম রাষ্ট্র পৃথিবীতে রাখবে না। মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের সাথেই ইহুদী কানেকশন আছে, কেবলমাত্র ইরানই ভিন্নধর্মী। এই ভিন্নধর্মী মুসলিম রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য ইহুদীরা নানান অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু তারপরও ইরান বহালতবিয়তে টিকে আছে এবং উন্নতি করে যাচ্ছে।

ইরান টিকে থাকার পিছনে দুটি বড় শক্তি কাজ করছে। একটি ইহুদীবিদ্বেষ, যা সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, অপরটি চীন রাশিয়ার সাথে সখ্যতা। ইরানকে রাশিয়া বন্ধুভাবে শুধু নয়, অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে সাহায্য করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত সম্পর্ক। বাংলাদেশ যদি ইহুদী বলয়ের বাইরের দেশের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরী করতে পারে তবে ঐ বিশেষ দেশটি কিংবা দেশগুলি বাংলাদেশের বিপদের দিনে পরিত্যাগ করবে না। অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে আবার রকমফের আছে। স্থায়ী স্থাপনায় বিনিয়োগ করা হলে সম্পর্কও স্থায়ী হয়। কোন কোন প্রকল্প শত বছরেরও হয়। ঐসব দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করে। জনসংখ্যা আদান প্রদানও স্থায়ী সম্পর্ক তৈরীর খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

কিন্তু বিশ্বের কোনো দেশের সাথেই বাংলাদেশের জনসংখ্যা আদান প্রদানের সম্পর্ক নেই। এই সেক্টর এবং প্রপঞ্চ একেবারেই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। কোনো কোনো দেশের জনসংখ্যা খুবই কম। কিন্তু তাদের চাষযোগ্য অহল্যাভূমির পরিমাণ খুবই বেশী। ঐসব দেশের সাথে নতুন করে বিষয় ভাবনায় আলাপ আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। জনসংখ্যা কোনো কোনো সময়ে সম্পদ। কিন্তু কখন কোথায় কে সম্পদ তা বাঙালিরা জানে না।

আমরা রণক্ষেত্রে আছি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়েই যুদ্ধ করতে হবে। আমাদের অনেক কিছুই আছে, আবার অনেক কিছুই নেই। তবে জনসংখ্যা যে আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই জনসংখ্যাই সম্পদ এখন। জনসংখ্যাই দেশকে বাঁচাতে পারবে। যাদের সাথে স্থায়ী সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনা নেই সেসব দেশে জনসংখ্যা পাঠানোতে কোনো লাভ হয় না। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকের বেশে জনসংখ্যা যাচ্ছে। তারা কাজ করে না কি জঙ্গিগিরি করে তা জানার কোনো উপায় নেই।

কেবলমাত্র রেমিটেন্সের জন্য শ্রমিক রপ্তানী। কিন্তু সম্ভাবনাময় দেশের সাথে শ্রমিক রপ্তানীই লক্ষ্য হবে না। জনসংখ্যা বিনিময় করা হবে সংস্কৃতিসহ। সাংস্কৃতিক লাইনেই প্রথম সম্পর্ক, সুসম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। সাংস্কৃতিক আদান প্রদান এত কম যে, অন্য বিষয়গুলি ভাবনাতেই আসে না, সাংস্কৃতিক যোগাযোগই প্রথম সূত্র হওয়া উচিত। মাও সে তুং যেমন বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের আগে তাদের উচিত পিংপং খেলা। এখন চীন-মার্কিন সম্পর্ক খুবই মধুর ও অর্থবহ। যদিও রাশিয়াকে কোনঠাসা করার জন্যেই তাদের চীনের সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল, তবুও বানিজ্যিক মুনাফার ব্যাপারটা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

জনসংখ্যাকে জাতীয় রক্ষাকবচ বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের অভিযোজনযোগ্য করে তোলা যায়। মোটিভেশন তো করতেই হবে। সবচেয়ে বড় কথা, তাদেরকে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কূটনৈতিক সাফল্য অসম্ভব কিছু নয়। আশা করি শাসক শ্রেণী জরুরত বুঝবে এবং ঠিকমত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

ড. ইশা মোহাম্মদ : অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।