কারিগরিতে প্রণোদনায়ও বাড়ছে না নারী শিক্ষার্থী

ঢাকা, সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯ | ৩ আষাঢ় ১৪২৬

কারিগরিতে প্রণোদনায়ও বাড়ছে না নারী শিক্ষার্থী

লুৎফর রহমান সোহাগ ৭:১২ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৬

কারিগরিতে প্রণোদনায়ও বাড়ছে না নারী শিক্ষার্থী

দেশের প্রচলিত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের সমান হলেও কারিগরি শিক্ষায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে তারা। কর্মমুখী এ শিক্ষা ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

সামাজিক কারণেই কারিগরি শিক্ষার প্রতি নারীরা অনাগ্রহী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে শতভাগ বৃত্তি প্রদান, কোটা সুবিধা প্রদান ও টিউশন ফি মওকুফের মত উদ্যোগও তেমন কাজে আসছে না।

প্রচলিত সাধারণ শিক্ষার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণ প্রায় সমান সমান। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর তথ্য অনুযায়ী ক্ষেত্রবিশেষে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বেশি। আর কয়েক বছরের মধ্যেই ছাত্রীরা উচ্চশিক্ষায়ও সমতা অর্জন করবে বলে একাধিক সেমিনারে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

তবে সাধারণ শিক্ষায় গত একদশকে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ব্যাপক হারে বাড়লেও কারিগরি শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ হতাশাজনক। দেশের সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে গত ১৬ জুন থেকে শুরু হওয়া ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পরিসংখ্যান দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুবোধ চন্দ্র ঢালী জানিয়েছেন, এবার ৪৫৬টি প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯১৮ জন শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৮২ জন ছাত্রের বিপরীতে ছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ২১ হাজার ৩৩৬ জন।

এছাড়া ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২৮ শতাংশ। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানেও একই ধরণের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। আর কারিগরি শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৭ শতাংশ বলে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ কম হওয়ার কারণ কী, এ বিষয়ে কোনো পর্যবেক্ষণ রয়েছে কি না জানতে চাইলে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, কারিগরি শিক্ষা আসলে মেয়েদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। তারা পার্টিকুলার কিছু টেকনোলজি প্রিফার করে। সবগুলো বিষয় প্রিফার করে না। তারা আসলে তাদের উপযোগী, কমফোর্টেবল ফিল করে এমন বিষয় বাছাই করে।

ব্যানবেইসের বিশ্লেষণেও তার এ যুক্তির প্রমাণ মেলে। সরকারি ওই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কারিগরিতে গ্লাস ও সিরামিক বিষয়ে মোট শিক্ষার্থীর ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, জরিপ শিক্ষায় ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ, গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ, টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটে ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ ছাত্রী অধ্যয়ন করে।

কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে ছাত্রীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা চালু ছিল। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ কোটা চালু করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সে লক্ষ্যমাত্রা পুরণ হয়নি। এছাড়া ছাত্রীদের আগ্রহী করে তুলতে কমিয়ে আনা হচ্ছে টিউশন ফিও।

ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমরা বিশ্লেষণ করে দেখেছি যে, কারিগরিতে ছাত্রীদের শতকরা হার কমলেও তাদের সংখ্যা বাড়ছে। তবে এটা ঠিক, আমরা পর্যাপ্ত মেয়েকে আকর্ষণ করতে পারিনি।

তিনি বলেন, মেয়েদের জন্য বৃত্তি প্রকল্প আছে। তাদের শতভাগ বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। মেয়েদের আগ্রহ সৃষ্টিতে এসব প্রচার-প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। সরকারি, এমনকি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও মেয়েদের জন্য টিউশন ফি মওকুফ করে দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি এসব উদ্যোগের ফলে কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়বে।

মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এ পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগের তুলনায় তো মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। আর তাদের প্রমোট করার জন্য পসিবল সব মেটার নেওয়া হচ্ছে। এসবের সুফল আসতে তো একটু সময় লাগবেই।

এদিকে সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়া হচ্ছে। দক্ষ জনসম্পদ তৈরির জন্য কারিগরি শিক্ষার পরিসর বাড়ানোর কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার এনরোলমেন্ট ২০ শতাংশে ও ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা ৬০ শতাংশ।

আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারীদের জন্য বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার।

নাহিদ বলেছেন, কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রতি বিভাগে মহিলা পলিটেকনিক স্থাপনের কাজ চলছে।

শিক্ষামন্ত্রী আরো জানিয়েছেন, দেশের পলিটেকনিকসমূহে নতুন আরো একলাখ শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যে বিদ্যমান পলিটেকনিকসমূহের অবকাঠামোগত সংস্কার, নতুন ২৩টি বিশ্বমানের পলিটেকনিক স্থাপনসহ নতুন ১২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে এ খাতে পাঁচটি প্রকল্প চালু আছে। এ বছর দেশের ৪৯টি পলিটেকনিক ও ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অতিরিক্ত ২৫ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী ভর্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আর এসব প্রকল্পে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান।

এলআর/একে