ইতিকাফ ও শবে কদর

ঢাকা, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯ | ১১ বৈশাখ ১৪২৬

ইতিকাফ ও শবে কদর

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী ৯:০৮ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০১৬

ইতিকাফ ও শবে কদর

হাদীস শরীফে শবে কদরের ফযিলত বা মাহাত্ম্য সম্বন্ধে তেমন বর্ণনা নেই। কারণ, কুরআন মজিদে একটি স্বতন্ত্র সূরা (সূরা কদর) নাযিল করে আল্লাহ পাক যেভাবে এই রাতের ফযিলত বর্ণনা করেছেন, তার চেয়ে অধিক ফযিলতের বর্ণনা অসম্ভব। তাই ফযিলত বর্ণনার পরিবর্তে হাদীস শরীফে এর দিনক্ষণ ও তালাশের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসালাম বলেছেন : ‘আমি শবে কদর তালাশ করতে গিয়ে (রমজানের) প্রথম দশক এ’তেকাফ করেছি। অতঃপর মধ্যম দশকেও এ’তেকাফ করেছি। এরপর স্বপ্নে কেউ এসে আমাকে বলল : ইহা শেষ দশকে। অতএব যে ব্যক্তি আমার সাথে প্রথমে এ’তেকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকেও এ’তেকাফ করে।(মিশকাত : ১৯৮৬)।

কোন রাতটি শবে কদর তার একটি পরিচয় বা লক্ষণ বলা হয়েছে, পরের দিনের সূর্যের কিরণ উদয়ের সময় নিস্তেজ হবে। (মুসলিমের বরাতে মিশকাত : ১৯৮৭) তাফসীরে মাইবেদীতে এর কারণ বলা হয়েছে, শবে কদরে রাতের বেলা যে অগণিত অসংখ্য ফেরেশতা আল্লাহর রহমত ও শান্তির সওগাত বিতরণ করেছেন, পরদিন ভোরে তারা আকাশে ফিরে যেতে ভীড়ের আবছা ছায়ায় সূর্যকে নিষ্প্রভ দেখা যায়।

প্রশ্ন হল, মসজিদে রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করার সুযোগ যাদের নেই তারা কীভাবে এই মহিমান্বিত রাতের ফজিলত লাভ করতে পারে। আমরা জেনেছি, রমজানের শেষ দশদিন মসজিদে ইতিকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এবং তার আসল লক্ষ্য শবে কদর তালাশ করা। আরেক প্রকারের ইতিকাফ আছে, যা মুস্তাহাব। মুস্তাহাব ইতিকাফে দশ দিনের শর্ত নেই। অল্প সময়ের জন্যও হতে পারে। কাজেই শবে কদর সন্ধানীরা দিনের বেলা সম্ভব না হলেও অন্তত শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে কাটাতে পারেন। এই মতের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায় এক হাদীসে।

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উনাইছ (র.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পল্লীগ্রামে আমার বাড়ি। আমি সেখানে বাস করি এবং আলহামদুলিল্লাহ সেখানে নামাজও পড়ি। সুতরাং আমাকে রমজানের একটি নির্দিষ্ট রাতের কথা বলে দিন, যাতে আমি (শবে কদরের তালাশে) আপনার মসজিদে আসতে পারি। তখন হুজুর (স.) বললেন : তুমি তেইশে (রমজান) রাতেই এসো। হাদীস (বর্ণনাকারী বলেন) তখন তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, তোমার পিতা তখন কি করতেন? সে উত্তরে বললো, তিনি যখন আসরের নামাজ পড়তেন তখন ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করতেন। অতঃপর (প্রাকৃতিক প্রয়োজন ব্যতীত) ফজর নামাজ না পড়া পর্যন্ত কোনো কাজে মসজিদ হতে বের হতেন না। যখন ফজর পড়তেন মসজিদের দরজায় আপন বাহনটি প্রস্তুত পেতেন এবং সেই বাহনে চড়ে আপন পল্লীতে চলে যেতেন। (আহমদ, আবু দাউদ এর বরাতে মিশকাত : ১৯৯৩)

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম : ইয়া রাসূলাল্লাহ্! বলুন, যদি আমি বুঝতে পারি ‘শবে কদর’ কোন রাত্রিতে, তখন আমি কি বলবো? তিনি বললেন : ‘তুমি বলবে, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন্ তুহিব্বুল আফওয়া ফা-ফু আন্নি।’ অর্থ : ‘প্রভু হে! তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালবাস। অতএব আমাকে ক্ষমা কর।’ আহমদ, ইবনু মাজা, তিরমিজী সূত্রে মিশকাত।

প্রাসঙ্গিক কারনে ইতিকাফ নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। ইতিকাফ অর্থ স্থির থাকা, অবস্থান করা। শরীয়তের পরিভাষায়, জাগতিক কার্যকলাপ ও পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সওয়াবের নিয়তে মসজিদ বা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান বা স্থির থাকাকে ইতিকাফ বলে।

ইতিকাফের সময় হলো রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত। রাসূল (সা.) বলেন, ‘আমি কদরের রাতের তালাশে প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম, এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন, অতপর ওহী প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে। সুতরাং, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইতিকাফ পছন্দ করে সে যেন ইতিকাফে বসে । (মুসলিম. ১৯৯৪)

ইসলামের ইবাদত বা উপাসনার বিধান পুরোহিত শ্রেণীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়, সবার জন্য অবারিত। নামাজ, রোজা, হজ্ব ও জাকাতের মধ্যে এই দর্শনটি অত্যন্ত সমুজ্জ্বল। আর যারা হৃদয়ের গহীনে আল্লাহর সাথে সম্বন্ধের যোগসূত্র মুঠোয় পেতে আগ্রহী, তাদের জন্য দেয়া হয়েছে ইতিকাফের বিধান। রমজানের শেষ দশদিন দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে একান্ত আল্লাহর হয়ে যেতে হবে সেই মানুষকে। আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের এই পদ্ধতি ইসলাম আসার আগেও বলবৎ ছিল। একবার হযরত উমর নবীজির কাছে জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল! জাহেলী যুগে আমি একদিন মসজিদুল হারামে ইতিকাফ করব বলে মানত করেছিলাম। নবীজি বললেন, তোমার মানত পূর্ণ কর। (মিশকাত-২০০০)

ইতিকাফের মানত করলে তা পালন করা ওয়াজিব হয়ে যায়। রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কেফায়া। অর্থাৎ মহল্লার কোন একজন যদি মহল্লার মসজিদে ইতিকাফ করে, তাহলে সবার পক্ষ হতে আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় একটি বড় সুন্নাত লংঘনের দায়ে সমাজের সবাই দোষী সাব্যস্ত হবে। আর নফল ইতিকাফ একদিন বা ১০ দিন নয়, স্বল্প সময়ের জন্যও হতে পারে। এর কিছু বিধিবদ্ধ নিয়ম আছে।

আবু দাউদ শরীফের রেওয়ায়াতে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, ইতিকাফকারীর কতিপয় নিয়ম পালন করা আবশ্যক। ১. সে কোনো রোগীকে দেখতে যাবে না। ২. কোনো জানাযায় হাজির হবে না। ৩. স্ত্রীর সাথে মেলমেশা করবে না এবং ৪. একান্ত বাধ্য না হলে মসজিদ থেকে বের হবে না। রোজা অবস্থায় ও জামে (নিয়মিত জামাত হয় এমন) মসজিদ ছাড়া ইতিকাফ শুদ্ধ হয় না। (মিশকাত-২০০৪)

ইতিকাফ মানে বান্দা সম্পূর্ণ আল্লাহর হয়ে যাওয়া। মসজিদে সাথীদের সাথে গল্প করা, মোবাইলে ফোনালাপ, গোসল করতে বেশি সময় লাগানো প্রভৃতি ইতিকাফের মেজাজের বরখেলাপ। মনে রাখতে হবে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া দুনিয়ার সবকিছুর চিন্তা থেকে মনকে মুক্ত করতে হবে। মনের বাড়ি সম্পূর্ণ খালি ও পরিষ্কার রাখতে হবে। কেবল এমন বাড়িতেই মহান প্রভুর সাক্ষাত নসীব হতে পারে। ব্যাপারটি মোটেও হেলাফেলার নয়।

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী : প্রাক্তন শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]